হিন্দু ধর্ম মতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি
মানুষের মনে চিরশ্বাশত একটি প্রশ্ন আছে সেটি হলো এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছিল কীভাবে?
হিন্দু ধর্ম মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড (সৃষ্টিজগত) অসীম ও চক্রাকারে সৃষ্ট ও বিনষ্ট হয়। সনাতন শাস্ত্রে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় নিয়ে নানা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। প্রধানত বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও দর্শনশাস্ত্রে এই বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও পরিচালনা: ত্রিমূর্তি ধারণা
হিন্দু দর্শনে ত্রিমূর্তি ধারণা অনুযায়ী সৃষ্টির তিনটি প্রধান দিক রয়েছে:
- ব্রহ্মা – সৃষ্টি করেন
- বিষ্ণু – পালন করেন
- শিব – বিনাশ করেন
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি
- ব্রহ্মাণ্ড অনেকগুলো স্তরে বিভক্ত, যার মধ্যে সপ্তলোক (ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বর্গলোক, মহলোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক) এবং সপ্ত পাতাল (অতল, বিতল, সুতল, রসাতল, মহাতল, তালাতল ও পাতাল) রয়েছে।
- পুরাণমতে, আমাদের দৃশ্যমান জগত একটি ব্রহ্মাণ্ডের অংশ মাত্র, এবং অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড (মাল্টিভার্স) বিদ্যমান, যা মহাবিশ্বের অংশ।
ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি তত্ত্ব
১. নাসাদীয় সূক্ত (ঋগ্বেদ ১০.১২৯)
এটি হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রাচীন সৃষ্টি তত্ত্ব, যেখানে বলা হয়েছে যে সৃষ্টির পূর্বে কিছুই ছিল না—না আকাশ, না পৃথিবী, না দিবস, না রাত। তখন একমাত্র অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব ছিল, যা ধীরে ধীরে চেতনার রূপ নেয় এবং সৃষ্টি হয়।
২. সমুদ্র মন্থন তত্ত্ব
ব্রহ্মাণ্ডের গঠন ও পরিচালনার জন্য দেবতা ও অসুরদের মধ্যে সমুদ্র মন্থন সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলে বিভিন্ন দেবত্বের শক্তি, রত্ন ও অমৃত উৎপন্ন হয়।
৩. ব্রহ্মার কমল থেকে সৃষ্টি
বিষ্ণুর নাভি থেকে এক কমলফুল উদগত হয়, যার মধ্য থেকে ব্রহ্মা জন্ম নেন এবং তিনিই চতুর্মুখী হয়ে সৃষ্টি শুরু করেন।
ব্রহ্মাণ্ডের সময়চক্র
হিন্দু শাস্ত্রে সময়কে চারটি যুগে বিভক্ত করা হয়েছে, যা একে অপরের পরিপূরক:
- সত্য যুগ (সত্য ও ধর্মের যুগ) – ১৭২৮০০০ বছর
- ত্রেতা যুগ (ধর্মের পতন শুরু) – ১২৯৬০০০ বছর
- দ্বাপর যুগ (কলহ বৃদ্ধি) – ৮৬৪০০০ বছর
- কলি যুগ (অধর্মের প্রাধান্য) – ৪৩২০০০ বছর
এই চার যুগ মিলিয়ে এক মহাযুগ (৪৩২০০০০ বছর) গঠন করে, এবং ১০০০ মহাযুগ এক ব্রহ্মার দিন সমান।
ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংস (প্রলয়)
ব্রহ্মার একদিনের শেষে প্রলয় (ধ্বংস) ঘটে, যেখানে শিব সমস্ত সৃষ্টিকে লয় করেন এবং কিছু সময় পরে পুনরায় সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আপনি কি আরও নির্দিষ্ট কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চান?
এর সঠিক উত্তর করো কাছ থেকে আজও মেলেনি: না বিজ্ঞানী না ধর্মীয় মহাপুরুষ। তবে সবাই কিছু না কিছু তথ্য আমাদেরকে দিয়েছেন তাদের বিদ্যা বা জ্ঞানভান্ডার থেকে, যদিও কোনটিই সম্পূর্ণ নয়। তাই চিন্তাশীল মানুষের মনে চিরজাগ্রত হয়ে আছে এই অসীম আকাশ, তার বুকে মিট মিট করে জ্বলে থাকা হাজারো নক্ষত্র ও তারকারাজি। মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীদের একটা বিশাল পার্থক্য আছে এবং সেটি হলো: মানুষ প্রশ্ন করতে পারে—কেন? আর এই ‘কেন’ মহামন্ত্রে বলিয়ান হয়ে মানুষ আজ অজানাকে জেনেছে এবং অপ্রাপ্যকে প্রাপ্ত হয়েছে। এবার আসুন দেখা যাক এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কেন্দ্র করে তাদের কী ভাষ্য।
![]() |
| বিশ্বব্রহ্মাণ্ড |
বিজ্ঞান তত্ত্ব।।
............
............
..............আমাদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি কোথার থেকে, বিজ্ঞানীরা আজও কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম থিওরি দিয়েছে কিন্তু প্রমান আজও করতে পারেনি। এদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য থিওরি 'বিগ ব্যাং থিওরি'। জর্জেস লিমায়ত্রে এই থিওরি প্রথম দিয়েছিল ১৯২৭ সালে। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এর থিওরি অফ রিলেটিভিটি E = mc2 সমীকরণ দ্বারা এক খ্রিস্টান চার্চের পাদরি যার নাম ছিল জর্জেস লিমায়ত্রে বলেছিলেন আমদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সময়ের সাথে সাথে প্রসারিত হচ্ছে। তিনি সেই সময়ই 'বিগ ব্যাং থিওরি ' কথা বলেন । সেই সময় আইনস্টাইন খুব বড় বিজ্ঞানী ছিলেন, সেই সময় আইনস্টাইন এই পাদরি জর্জেস লিমায়ত্রে কে বলেন তোমার গণিতে কোনো ভুল নেই, কিন্তু বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ সম্ভব নয় । তাঁর মতে শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অযৌক্তিক । ১৯৫৫ তে আইনস্টাইন ও ১৯৬৬ তে জর্জেস মারা যান।পরবর্তীতে হাবল টেলিস্কোপ এর দ্বারা বিজ্ঞানীরা দেখলো যে আমদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হচ্ছে। এই ঘটনা বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন ফেলে দেয় আবার উঠে আসে জর্জেস লিমায়ত্রের সেই ' বিগ ব্যাং থিওরি ' । জর্জেস লিমায়ত্রের মতে একটি বিন্দু অ্যাটম থেকে আমাদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড অস্তিত্বে এসেছে। ওই আদিম অ্যাটম কনা শক্তিশালী হয়ে একটা সময় বিস্ফোরণ ঘটায় , ওই বিস্ফোরণের পরই আমদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রথম অস্থিত্বে এসেছে এবং সেই প্রসারণ এখনো চলছে। এখন প্রশ্ন আইনস্টাইন কেন সেই সময় এই থিওরি মেনে নিতে পারেনি? তাঁর কারণ হল আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন, ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ সূত্রে তিনি 'তানাখ' বা হিব্রু বাইবেল এ উল্লেখিত উপদেশ ছোট থেকে শুনে ও মেনে এসেছেন। হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ঈশ্বরের সৃষ্টি, ঈশ্বর যেমন বালি থেকে প্রথম মানুষ ' আদম ' বানিয়েছে , তেমনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তার বানানো । এই 'তানাখ বা হিব্রু বাইবেল' এ লেখা আছে ঈশ্বর প্রথমে মহাকাশ বানায়। শুধু হিব্রু বাইবেল এ নয় খ্রিস্টানদের 'বাইবেলে'এবং মুসলিম দের 'কোরান ' এই তিনটি ধর্ম গ্রন্থে একই কথা আছে যে ঈশ্বর প্রথমে হওয়া বানিয়েছে, মানে মহাকাশ বানিয়েছে, যেটা স্থির। এই ধর্ম গুলোতে এটাও বলা হয়েছেপৃথিবী স্থির, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।এই ধর্ম গ্রন্থে যে ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে সেই ঈশ্বর অনন্ত যার কোনো রুপ নেই , যাকে কল্পনা করা যায় না। ইহুদীদের মতে একমাত্র নবী আব্রাহাম, খিষ্টানরা যীশু কে শেষ নবী মনে করে এবং মুসলিমরা আব্রাহাম হল প্রথম নবী, ঈশা মানে যীশু হলো ষষ্ঠ নবী এবং হজরত মহম্মদ হল সপ্তম বা শেষ নবী। এই জন্য আইনস্টাইন সহ অনেক বিজ্ঞানীরা সেই সময় এই 'বিগ ব্যাং থিওরি ' মেনে নিতে পারেনি। সেই সময় জর্জেস এর কাছে শুধু সমীকরণ ছিল যার দ্বারা সে এই থিওরি দিয়েছিল, তার সমীকরণ ঠিক থাকলেও অনেকই তার তত্ত্ব মেনে নেয় নি। পরবর্তীতে দেখা গেল জর্জেস লিমায়ত্রের সমীকরণ ও তত্ত্ব দুটোই ঠিক ছিল।বর্তমান কালে বিজ্ঞানীরা আরও নতুন তত্ত্ব দিয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব বা থিওরি হল 'সমান্তরাল মহাবিশ্ব' বা ' প্যারালাল ইউনিভার্স ' , যাকে মাল্টিভার্স ও বলে। বর্তমান সময়ে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে এই মহা বিশ্বের শুরু দেখতে গিয়ে অনেক নতুন তথ্য উঠে আসছে , প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত হওয়ার কারণে আমদের বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড অন্য বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কাছে চলে আসছে, এর থেকে উঠে আসছে সমান্তরাল মহা বিশ্বের তত্ত্ব। আমাদের মহা বিশ্ব একমাএ মহা বিশ্ব নয় সেটা জেমেশ ওয়েব টেলিস্কোপ দ্বারা বিজ্ঞানীরা বুজতে পেরেছেন। আরো কত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আছে তার উত্তর তারা খুঁজছে, হয়তো তাদের ক্ষেত্রেও সেটা বের করা সম্ভব হবে না। কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন সমান্তরাল মহা বিশ্বে ১১ টি ডাইমেনশন অস্থিত্ব আছে বলে দাবি করে থাকে তবে তাদের কাছে প্রমাণ নেই শুধু আছে থিওরি বা তত্ত্ব। আমরা 3d বা ৩ ডাইমেনশন পৃথিবীতে বসবাস করি। এই বিজ্ঞানীরা মনে করে এমন কিছু বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড আছে যেখানে 4,5,6 করে 11 ডাইমেনশনের অস্থিত্ব আছে। আমদের সনাতন হিন্দু ধর্মে 64 / ৬৪ ডাইমেনশন এর কথা বলা আছে ।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল গবেষণা করে নির্ণয় করেছেন যে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১৫০০ কোটি বছর পূর্বে এবং অদ্যাবধি এ সৃষ্টিধারা অব্যাহত রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এ তত্ত্বটির নাম দিয়েছিলেন বিগ ব্যাং থিওরি (Big Bang Theory)। তথ্যটি নেহাৎ অলিক নয়, কারণ এ আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানীরা তিন তিন বার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন: ১৯৭৮, ২০০৬ এবং ২০১১। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা হলেন আর্ম পিনাজিয়াস ও রবার্ট উইলসন (১৯৭৮), এবং জন মাথার ও জর্জ স্মুট (২০০৬)।
এ আবিষ্কারের প্রথম দিকে ধর্মীয় নেতারা উচ্চ বাচ্চ্য করলেও নোবেল প্রাপ্তির পর তারা কিছুটা নড়ে চড়ে বসেন এবং বলতে শুরু করেন যে তাদের ধর্মেও এর কিছুটা আভাস আছে। একটি গবেষণার ফলকে অতি সহজেই তুলেধুনা করা যায় কিন্তু সেটি যখন নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়, তখন কটাক্ষ করলে জনরোষে পড়ার প্রভূত আশঙ্কা থাকে। তাই জগৎ সৃষ্টির এ তত্ত্বটিকে অগত্য মধুসুধনের মতো হজম করতে হয়েছে ধর্ম গুরুদের।
তবে একটি ধর্মের সঙ্গে এ সৃষ্টি তত্ত্বটির মিল ছিল এবং সেটি হচ্ছে সনাতন ধর্ম। মহামূল্য ঋগবেদের নিসা পর্বে ১৬টি শ্লোকে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল একটি বিন্দু থেকে।
অতি সংক্ষেপে দেখা যাক বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বে বিজ্ঞানীরা কী বলেছিলেন এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উৎপত্তি কারণ হিসেবে। তাদের মতে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি শুরু হয়েছিল একটি অতি ক্ষুদ্র দানা থেকে এবং সৃষ্টির প্রাথমিক কালে মহাবিশ্ব সুষম এবং সমতাপীয় রূপে একটিই অতি উচ্চ শক্তি ঘনত্ব এবং উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপবিশিষ্ট পদার্থ দ্বারা পূর্ণ ছিল। পরবর্তিতে এ ক্ষুদ্রকায় বিন্দুটি সম্প্রসারিত হতে থাকে, তবে কোথায় হতে এবং কিভাবে এ অতি ক্ষুদ্র পিণ্ডটি আবির্ভূত হয়েছিল তার হদিস বিজ্ঞানীরা আজও খুঁজে না পেলেও এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ পেয়েছিলেন যে ওই ক্ষুদ্র বিন্দুটি ছিল একক্ধর্মী বা সুষম (singularity) এবং ওই বিস্ফোরণের পূর্বে না ছিল কোনো সময় (time), না জায়গা (space) এবং না কোনো পদার্থ (matter)।
উপসংহার
হিন্দু ধর্ম মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চক্রাকারে সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়। এটি এক ধরণের চিরন্তন ও অনন্ত জগৎ, যেখানে ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সবকিছু পরিচালিত হয়।
