শ্রাদ্ধান্ন কি খাওয়া উচিত?

শ্রাদ্ধে খাওয়া উচিত নয় বা কিছু মানুষ কেন শ্রাদ্ধের খাবার গ্রহণ করেন না, তা নিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। এখানে প্রধান কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো:

১. ধর্মীয় কারণ:

  • হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, শ্রাদ্ধ একটি পিতৃতর্পণ বা পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা। এটি এক ধরনের অর্ঘ্য ও দানমূলক কার্যক্রম যেখানে প্রধানত ব্রাহ্মণ, দরিদ্র ও অতিথিদের আহার করানো হয়।
  • কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রাদ্ধের খাবার পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, তাই তা অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
  • মনে করা হয়, এই খাবার গ্রহণ করলে দেহ ও মন ভারাক্রান্ত হতে পারে এবং এটি সাধারণ মানুষের জন্য শুদ্ধ নয়।

২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ:

  • কিছু সমাজে শ্রাদ্ধের খাবারকে শোকের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়, তাই জীবিতদের জন্য তা বর্জনীয়।
  • প্রাচীনকাল থেকেই অনেকে বিশ্বাস করেন যে, শ্রাদ্ধের খাবার বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয় পূর্বপুরুষদের সন্তুষ্ট করার জন্য, তাই সাধারণ মানুষের তা খাওয়া উচিত নয়।

৩. আধ্যাত্মিক কারণ:

  • অনেকেই মনে করেন যে, শ্রাদ্ধের খাবার খেলে দেহে নেতিবাচক শক্তি প্রবেশ করতে পারে, যা মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
  • কিছু সম্প্রদায়ে ধারণা করা হয়, এটি গ্রহণ করলে পার্থিব বন্ধন শক্তিশালী হয় এবং মোক্ষপ্রাপ্তির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

৪. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিশ্বাস:

  • কিছু পরিবার ও সম্প্রদায়ে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, ফলে প্রথাগতভাবে তারা শ্রাদ্ধের খাবার গ্রহণ করেন না।
  • অন্যদিকে, অনেকে এটিকে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ হিসেবেও মনে করেন এবং শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেন।

শ্রাদ্ধান্ন কি খাওয়া উচিত?

      বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক তথা ধর্মগুরু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন,- “শ্রাদ্ধান্ন যেহেতু প্রীতান্ন বা আপদান্ন কোনটাই নয়, তাই তা গ্রহণ করা অবিধেয়”। অর্থাৎ শ্রাদ্ধের অন্ন কারও গ্রহণ করা উচিৎ নয়। কেননা সে ভালবেসে, আদর করে কাউকে এখানে খেতে দিচ্ছে না, তাই এটা প্রীতান্ন নয়। আবার সমাজের কেউ এমন বিপদেও পড়েনি যে এই খাবার না খেলে সে মারা যাবে, তাই এটা আপদান্নও নয়। তাই কেন আমরা এই শ্রাদ্ধান্ন, শোকের অন্ন গ্রহণ করবো? এই সময়ে সবার উচিত শোকগ্রস্থ, বিপদগ্রস্থ  পরিবারকে সান্তনা দেওয়া, তাদের সাহায্য করা। কিন্তু যেখানে সমাজের উচিত শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্তনা দেওয়া, তাদের এই মহা বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, তা না করে তাদের এই বিপদের সুযোগ নিয়ে তাদের নির্মম ভাবে শোষণ করা হচ্ছে শত শত বৎসর ধরে।

শ্রাদ্ধান্ন কি খাওয়া উচিত?
শ্রীমদ্ভাগবদ্ গীতায় ব্যাখ্যায় করে বলা হয়েছে-- "একটি দেহ ত্যাগ করার পর অন্য একটি দেহ লাভ হয়, কিন্তু কখনও কখনও কেউ যদি অত্যন্ত পাপী হয়, তা হলে সে অন্য আর একটি দেহে দেহান্তরিত হয়না-- সে প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়। মৃত ব্যক্তিকে প্রেতযোনি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য শাস্ত্রের বিধান অনুসারে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করা অবশ্য।"

* ১০০ পরলোকগত জীবাত্মার মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্যে পারলৌকিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান করা হয়। কর্মদোষে যে ব্যক্তি পরজন্মে দুর্গতি দুর্দশা ভোগ করতে থাকে, সেই ব্যক্তির বংশধর তার মঙ্গল বিধানের জন্য শ্রাদ্ধ ইত্যাদি অনুষ্ঠান করেন, যাতে পরলোকগত জীবাত্মার সদগতি লাভ হয়। যে ব্যক্তির বংশধর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করেনা, তাদের পরলোকগত ব্যক্তির শান্তি লাভ হয়না। কর্ম বিপাকে পরলোকে সেই ব্যক্তি দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে থাকে।

১৫ ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে বলা হয়েছে- *যযঃ শ্রাদ্ধকালে

* হরিভুক্তশেষং *দদদাতি ভক্ত্যা পিতৃদেবতানাম্। *ততেনৈব পিণ্ডাংস্তুলসীবা মিশ্রাণা- *ককল্পকোটিং পিতর সুতৃপ্তাঃ।

* * " শ্রীহরির মহাপ্রসাদ এবং তুলসী মিশ্রিত পিণ্ড শ্রাদ্ধেরদিনে ভক্তিসহকারে পিতৃ বা দেবগণকে অর্পন করলে পিতৃগণ কোটিকল্প পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ করে থাকেন।"

* ১০ পরলোকগত ব্যক্তির পরজীবনে যাতে সদ্ গতি হয়, মঙ্গল হয়, সেই উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা হয়। আর তাঁর শ্রাদ্ধ করলে ইহলোকের বংশধর পবিত্র হয়। রামায়ণে ৭৬ সর্গে বলা হয়েছে, "ব্রাহ্মণেরা উপস্থিত হয়ে রাজা দশরথকে চিতা মধ্যে স্থাপন করে জলন্ত আগুনে আহুতি দিয়ে তাঁর পারলৌকিক শুদ্ধির উদ্দেশ্যে মন্ত্র জপ করতে লাগলেন।... দশাহ অতীত হলে ভরত শ্রাদ্ধ করে পবিত্র হলেন এবং দ্বাদশাহে দ্বিতীয় মাসিক প্রভৃতি সপ্তিন্ডীকরণ পর্যন্ত সমস্ত অনুষ্ঠান করে পিতার পারলোকিক ফল আকাঙ্ক্ষায় ব্রাহ্মণদের ধনরত্ন, ভোজ্য, গো, বসন দান করলেন।

উপসংহার:

শ্রাদ্ধের খাবার খাওয়া উচিত কি না, তা একেবারে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে। কেউ একে নিষিদ্ধ মনে করেন, আবার কেউ এটি খেতে আপত্তি করেন না। তাই ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ভেদে এর গ্রহণযোগ্যতা পরিবর্তিত হতে পারে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url