ভোগ নিবেদনের নিয়ম ও মন্ত্র

"ভোগ নিবেদন" মূলত হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে দেবতা বা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ভোগ বা প্রসাদ নিবেদন করা হয়। এটি ভক্তির প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সাধারণত পূজা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় সম্পন্ন হয়।


ভোগ নিবেদন পদ্ধতিঃ

যদিও গৃহে শ্রীবিগ্রহ উপাসনার ক্ষেত্রে সর্বদা সঠিক সময়ে ভোগ নিবেদন পদ্ধতি নিয়মানুবর্তিতা  আশা করা চলে না, তা হলেও যথা সম্ভব সময়ানুবর্তিতা অবলম্বন করতে চেষ্টা করা উচিত। যখনই যা কিছু খাদ্য সামগ্রী তৈরী হবে, তখনই তা অবশ্যই শ্রীবিগ্রহাদির প্রীতিবিধানে নিবেদন করা চাই, ফলে নিবেদনের সংখ্যা কম বেশী হতে পারে। 

যাই হোক,দিনের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট ভোগ নিবেদননের সময় অবশ্যই নির্ধারিত থাকবে (যেমন প্রাতরাশ, মধ্যাহ্নভোজ, নৈশভোজ) যার সাথে পরিবার বর্গের রান্নাবান্নার কার্যসূচীরও সামঞ্জস্য করে নিতে হবে।  


প্রারম্ভিক করণীয়  

শ্রীবিগ্রহ কক্ষের বাইরে আচমন সেরে শ্রীগুরদেব এবং শ্রীবিগ্রহাদির উদ্দেশ্যে দন্ডবৎ প্রণাম সহ মন্ত্রোচ্চারণ।  হাতে তালি বাজিয়ে, বা ঘণ্টাধ্বনি করে, কিংবা দরজায় টোকা দিয়ে শ্রীবিগ্রহাদির মনোযোগ আকর্ষণ করা দরকার তারপরে শ্রীবিগ্রহ নাম জপ করতে করতে বিগ্রহ কক্ষে প্রবেশ করতে হয়।   ভোগনিবেদনের জায়গাটুকু পরিষ্কার করে, নিজের হাত ধুয়ে, খাদ্যসামগ্রী রাখবার জায়গাটি পরিষ্কার করে, টেবিল মুছে রাখতে হয়।  ঘণ্টা বাজিয়ে, শ্রীগুরুদেবের চরণপ্রান্তে কিছু ফুল দিয়ে শ্রীবিগ্রহ সেবার অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়। (প্রয়োজন হলে, ফুলের পরিবর্তে পঞ্চপাত্র থেকে জল অর্পণ করা চলে- চামচে জল নিয়ে শ্রীগুরুদেবের প্রতিকৃতির উদ্দেশ্যে ধারণ করে তার পরে সেই জল বিসর্জনীয় পাত্রে ফেলে দিতে হয়। তা না হলে শুধুমাত্র মানসভাবে ফুল নিবেদন করাও চলে।)  শ্রীগুরুদেবের জন্য একটি আসন নিবেদন করা চাই।  

 

ভোগ ও শুদ্ধিকরণ  

ভোগ নিবেদনের পাত্রগুলি এনে টেবিলে বা চৌকিতে রাখতে হয়। ডান হাত দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল ছিটিয়ে প্রত্যেকটি পাত্রকে প্রোক্ষণ করতে হয় এবং প্রত্যেক পাত্রে তুলসীপত্র দিতে হয়।   ভোগ গ্রহণের জন্য শ্রীভগবানকে আমন্ত্রণ ঘণ্টা বাজিয়ে শ্রীবিগ্রহাদির মর্যাদা অনুসারে একে একে প্রত্যেকের শ্রীচরণে পুষ্প নিবেদন করে মনোযোগ আকর্ষণ করা দরকার এবং পরে ভোগ-নৈবেদ্যের আহার্য সামগ্রী গ্রহণের জন্য তাঁদের প্রার্থনা জানাতে হয়। (প্রয়োজন হলে পুষ্প নিবেদনের পরিবর্তে পঞ্চপাত্র থেকে জল নিবেদন করা চলে, কিংবা শুধুমাত্র মানসভাবে পুষ্প নিবেদন করলেও হয়।)   


আসনের জন্য কোনও আসন বা গদি যদি না থাকে, তা হলে শ্রীবিগ্রহাদির উদ্দেশ্যে নিবেদিত ভোগপাত্রগুলির সামনেই কিছু ফুলের পাঁপড়ি রাখা যায়। শ্রীবিগ্রহাদির মর্যাদাক্রমে এবং হাত দিয়ে তাঁদের নিয়ে আসার ভঙ্গিতে ভোগ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ করতে হয়।   আসনে বসে বাঁ হতে ঘণ্টা বাজিয়ে, পঞ্চপাত্র থেকে জল নিয়ে শ্রীগুরুদেব এবং তার পরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু থেকে শুরু করে তাঁর পার্ষদবৃন্দ, অন্যান্য শ্রীবিগ্রহাদি হয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর সহচরদের উদ্দেশ্যে পাদ্য অর্ঘ্য ও আচমন নিবেদন করতে হয়।   

পাদ্য অর্ঘ্য এবং আচমনের জন্য নেওয়া প্রত্যেকবার চামচ ভর্তি জল বিসর্জনীয় পাত্রে ফেলে দিতে হয়।

কোথাও কোন স্থানে যদি গীতা সংঘ বাড়িতে কিংবা অন্যান্য কোন গৃহে ভোগ দিতে কেহ মনস্থ করেন; তবে নিম্নোক্ত বিধানে তাহা করিবেন। যে কোন পূজার শেষে ভোগ দিতে হয়। পূজকের স্ববামে পবিত্র জায়গায় আচমনীয় জল মুরা একটি চতুস্কোন মণ্ডল করিয়া; তদুপরি অন্নব্যাঞ্জন ও অন্যান্য মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি পাত্র স্থাপন করিবেন। তৎপর অন্নাদি ভোগ পাত্রের উপরে আচমনীয় জল পুষ্প দ্বারা ছিটাইয়া দিতে দিতে বলিবেন।


যথাঃ," বং এতস্মৈ সোপ করনাম্নায় নম:” বলিয়া তুলসী পত্র সহ গন্ধ পুষ্প প্রদান করিবেন। পরবর্তীতে কুশীতে একটু জল লইয়া, অমৃত পস্তরণ মসি স্বাহা' বলিয়া ভোগের দ্রব্য সামগ্রীতে কিঞ্চিৎ জল দিবেন। তারপর ধেনু মুদ্রয়ায় অমৃত করণ করিবেন। ধেনু মুদ্রা যথা, উভয় হস্তের অঙ্গুলি গুলিকে পরষ্পরের সন্ধি মধ্যগত করিয়া কনিষ্ঠার সহিত অনামিকা যোগ করিয়া, পরে তর্জ্জনীর অগ্রভাগের সহিত মধ্যমার অগ্রভাগ যুক্ত করিলে, তাহাকে ধেনু মুদ্রা বলে । উক্ত মুদ্রা প্রদর্শন করত: পরে মৎস্যমুদ্রা দ্বারা আচ্ছাদন পূর্বক ভোগাদির উপর দশবার বীজ মন্ত্র জপ করিবেন। 

মৎস্য মুদ্রা যথা, ডাইন হাত মাটিমুখে করিয়া তাহার পৃষ্ঠে বাম হস্ত স্থাপন করত: উভয় অসুষ্ঠ পরিচালিত করাতে মৎস্য মুদ্রা বলে। এই মুদ্রা কৃত ভোগ পাত্রের উপরে "ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় স্বাহা” বলিয়া দশবার জগ করিবেন। তৎপর বামহস্ত চিত করিয়া অঙ্গুলি সকল প্রসারিত করতঃ, কিঞ্চিৎ বজ্র করিলে গ্রাস মুদ্রা হইবে। উক্ত মুদ্ৰা দেখাইয়া পরে ঘন্টাধ্বনী করত: গঙ্কগুষ্প হাতে লইযা অন্নব্যাঞ্জনাদি নিবেদন করিবেন।


অন্নব্যঞ্জনাদি নিবেদন মন্ত্রঃ


ওঁ অন্নব্যাঞ্জনং চতুববধং ।


রসোয়ৈ ষড়ভি সমন্বিতম উত্তম প্রাণদঞ্চৈব


গৃহান প্রভু জনাৰ্দ্দন: ॥


ইদমন্নব্যাঞ্জনং ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নমঃ।




ভোগ পাত্রের উপরে তুলসীপত্র সহ গন্ধপুষ্প দিবেন। খিচুরী নিবেদন করিতে হইলে তাহার বাক্য পাঠ পৃথক হইবে।


খিচুরী নিবেদন মন্ত্রঃ


ওঁ গব্য সর্পি: কর্পুরাদি নানা মধুর সংযুতম্ । 


ময়া নিবেদিম্ ভক্ত্যা কৃষ্ণারান্নাং গৃহ্যতাং প্রভু পরমেশ্বর। ইদং কৃষারান্নং ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নমঃ।




মিষ্টান্ন নিবেদন মন্ত্রঃ


বাসিতম্। গব্য সর্পি: পয়োযুক্তং কর্পুরাদি সংযুতম্। 


ময়া নিবেদিতং ভক্ত্যাপরমান্নং প্রতি গৃহ্যতাম্ ॥


ইদং পরমান্নং ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নমঃ।


গন্ধপুষ্প তুলসীপত্র দিয়া নিবেদন করিবেন। তৎপর পঞ্চ প্রাণাহুতি মুদ্রাক্রমে একটু করিয়া জল দিবেন। মুদ্রাক্রম যথা, পঞ্চ প্রাণাহুতি মুদ্রা। দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুষ্ঠ, কনিষ্ঠা ও অনামিকা যোগে, “ওঁ প্রাণায় স্বাহা”, তৎপর অঙ্গুষ্ঠ, তজ্জনী ও মধ্যমা যোগে, “ওঁ অপনায় স্বাহা,” তারপর অঙ্গুষ্ঠ, মধ্যমা ও অনামিকা যোগে, ওঁ সমানায় স্বাহা," পর কনিষ্ঠা বাদে চতুরাঙ্গুলি যোগে, “ওঁ উদানায় স্বাহা, " পঞ্চাঙ্গুলি যোগে, ওঁ ব্যানায় স্বাহা। এই রূপে পঞ্চপ্রাণাহুতি মুদ্রায় একটু করিয়া জলদানের পর পুনঃকুশীতে জল লইয়া, “ওঁ অমৃতপিধানমসিস্বাহা,” বলিয়া উক্ত জল ভোগ পাত্রে প্রদান পূর্ব্বক পানার্থ জল দিবেন। যথা, ইদং পানার্থ জলং ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নম:, ইদং পুনরাচ মনীয়ম্ জলং ওঁ কৃষ্ণায় নমঃ, এতত্তাম্বুলং ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নম: । এষ সচন্দন গন্ধ পুষ্পাঞ্জলি ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় নমঃ ।


স্তব পাঠ


ওঁ অয়িনন্দ তনুজ কিঙ্করং পতিতং মাংঘোর বিষমে। তবাম্বুদৌ কৃপয়া তৎপদং পঙ্কজং স্থিতম্ ॥


ধুলি সদৃশং বিচিন্তয়েৎ হরিগুরু ।




শ্রীমতি রাধা রাণীর ভোগ নিবেদন


একই অনুকরণে ভোগ নিবেদন করিবেন। শুধুমাত্র বীজ মন্ত্রাদি পৃথক বলিয়া জানিবেন। নিম্নে তাহা বর্ণিত হইল। যথা,


অন্ননিবেদন মন্ত্রঃ


ওঁ অন্নব্যঞ্জনং চতুবিধং রসৌয়ে ষড়তি সমন্বিতাম্।  উত্তম প্রাণদঞ্চৈব গৃহান দেবী পরমেশ্বরী ॥


ইদমন্নব্যঞ্জনং ওঁত্রী শ্রীং রাধিকায়ৈ নমঃ।


খিচুরী নিবেদন মন্ত্রঃ


ওঁ গব্যসপি: কর্পুরাদি নানা মধুর সংযুতম্ ।


ময়া নিবেদিতম্ ভক্ত্যা কৃষারান্নং গৃহ্যতাং দেবীরাসেশ্বরী৷ 


ইদং কৃষারান্নং ওঁ হ্রীং শ্রীং রাধিকায়ৈ নমঃ । 




মিষ্টান্ন নিবেদন মন্ত্রঃ


ওঁ গব্যসর্পি: পয়োযুক্তং কর্পুরাদি সুবাসিতম্।


ময়া নিবেদিতম্ ভক্ত্যা পরমান্নং প্রতিগৃহ্যতাম্ ॥


ইদং পরমানং ওঁ হ্রীং শ্রীং রাধিকায়ৈ নমঃ।




এইভাবে সকল দ্রব্য নিবেদন করত: এবং তাহাতে গন্ধ পুষ্প দিয়া মৎস্য মুদ্রায় আচ্ছাদন পূৰ্ব্বক "ওঁ হ্রীং শ্রীং রাধিকায়ৈ নম: এই বীজমন্ত্র: দশবার জপ করত:, পরে উক্ত মন্ত্রে পানার্থ ও গুন: রাচমনীয় দিবেন। তৎপর “ইদং তাম্বুলং ওঁ হ্রীং . শ্রীং রাধিকায়ৈ নম:" গন্ধপুষ্প দিবেন। এষ সচন্দন গন্ধ পুষ্পাঞ্জলি ওঁ হ্রীং শ্রীং যাধিকায়ৈ নম:। ইহা তিনবার দিবেন। তৎপর প্রণাম বাক্য পাঠ করিবেন। ইহার পর যথা শক্তি জগ করিয়া, জপ বিসর্জ্জন করত পূজা সমাপ্ত করিবেন। যেখানে ভোগের কার্যাদি করিতে হইবে সেই স্থানে ভোগাদি কার্য্য সমাধানের পর আরতি করিবেন। নতুবা ইতিপূর্ব্বে যাহা নিরুপিত হইয়াছে তাহাই সঠিক থাকিবে। অতএব এই স্থানে আর নতুন করিয়া আরতি বিধিমালা লিখিত হইল না।


ভোগ নিবেদনের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া:

উদ্দেশ্য: ভক্তি ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে দেবতাকে অর্পণ করা।

উপকরণ: ফল, মিষ্টান্ন, খিচুড়ি, পায়েস, দুধ, মধু ইত্যাদি।

প্রক্রিয়া:

নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভোগ প্রস্তুত করা হয়।

পূজার সময় নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করে ভোগ নিবেদন করা হয়।

ভোগ নিবেদনের পর সেটি প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

ভোগ নিবেদন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় আলাদা নিয়মে করা হয়, যেমন – মা দুর্গার পূজায় খিচুড়ি-ভোগ, শ্রীকৃষ্ণের পূজায় মাখন-মিষ্টি, শিবের পূজায় ফলমূল।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url